Friday, April 4, 2025

রহস্যময় ভানগড় দুর্গ, আজও আতঙ্ক ধরায় দর্শনার্থীদের

- Advertisement -

ভানগড় কেল্লার দরজার উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। ঢুকলেই সামনে বাগান। বাগানে ফুলের সুবাস থাকে সব সময়। প্রচণ্ড খরাতেও বাগানের কোনও ফুল নাকি শুকিয়ে যায় না কখনও, এমন বিশ্বাস স্থানীয়দের। এও এক রহস্য! বাগান পেরিয়ে সামনে এগোলেই জলাধার দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় ভাষায় একে ‘বাউলি’ বলে। বাউলির এই অংশ থেকেই অনেকে দিনের বিভিন্ন সময়ে নূপুরের শব্দ শুনতে পেয়েছে।


ভানগড়

পৃথিবীতে এমন কিছু ভূতুরে জায়গা আছে, যেগুলি নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। তাদের বেশ কয়েকটি আবার ভারতবর্ষেই আছে। রাজস্থানের আলবর জেলার ভানগড় দুর্গটি তার মধ্যে অন্যতম। প্রশাসনিক নির্দেশ অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টার পর দুর্গের ভিতরে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। কারণ গভীর রাতে ওই দুর্গে নাকি কোনও অদৃশ্য নর্তকীদের প্রেতাত্মার নাচসহ বিভিন্ন অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে, যা স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সহ্য করা প্রায় অসম্ভব। তাই বিশ্বের সেরা দশটি হন্টেড স্থানের একটি হিসেবে ধরা হয় ভানগড় দুর্গকে।

শোনা যায়, একবার দুই স্থানীয় দুঃসাহসী যুবক সন্ধ্যা ঘনিয়ে যাওয়ার পর দুর্গের পাঁচিল টপকে ভিতরে ঢুকেছিল। কিন্তু পরে আর তাদের ফিরে আসতে দেখা যায়নি। তারা দুর্গের ভিতরেই মারা গিয়েছিল কিনা সেটাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পর আরেকটি দল সেখানে উপস্থিত হয়েছিল। তিনজনের দলটি ভূতের অভিজ্ঞতা নিতে সন্ধ্যার পর আলো জ্বালিয়ে প্রবেশ করে দুর্গে। এক বন্ধু চেয়েছিল পুরো রাতটাই সেখানে কাটিয়ে দিতে। কিন্তু তার সঙ্গীরা রাত কাটাতে অস্বীকার করে। তবু সে অবাধ্য হয়ে ভিতরে রয়ে গেল আর তার অপেক্ষায় দুর্গের বাইরে গাড়িতে অপেক্ষা করতে থাকল তার বন্ধুরা। পরের দিন ভোরবেলা দুর্গের ভিতরে প্রবেশ করে বন্ধুকে অর্ধমৃত অবস্থায় খুঁজে পেল তারা। তাকে উদ্ধার করে যখন দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই গাড়িটি হঠাৎ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। মারা যায় দুই বন্ধুসহ গাড়ির ড্রাইভারও।

এরপর থেকে সেই ‘রহস্যময়’ দুর্গে রাত কাটানো একেবারেই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে কেল্লাটির ভীতিকর বিভিন্ন গল্প ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে। দিনে দিনে এর সঙ্গে যোগ হয় আরও অনেক কল্পিত কাহিনী। যে কাহিনীর কোনটা সত্য আর কোনটা বানানো তা এখন বোঝা প্রায় মুশকিল।

যদিও পর্যটকরা নিয়মিত ভানগড় দর্শন করতে যায়। কিন্তু সূর্যাস্তের আগেই তাদের প্রত্যেককে দুর্গ থেকে বের করে দেওয়া হয়। রাতে এর ধারে পাশেও ঘেঁসতে দেওয়া হয় না কাউকে। দূরের পর্যটকদের রাত কাটাতে হয় কমপক্ষে ৫০ কিলোমিটার দূরের সিরিস্কায়।

- Advertisement -

ইতিহাস বলছে, ১৫৭৩ সালে রাজা ভগবন্ত দাস তার কনিষ্ঠ পুত্র মাধো সিংহের জন্যে এই নগরটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। তার পরবর্তী তিন পুরুষ এই নগর শাসন ও পরিচালনা করে। তবে দুর্গ সহ এই ভানগড় নগর কীভাবে ধ্বংস হয়েছিল সেও এক রহস্যের। এ নিয়েও প্রচলিত আছে বিভিন্ন কথা। যেগুলি অনেকটা রহস্য গল্পের মতো।

কথিত আছে, ভানগড় এর রাজকুমারী রত্মাবলী ছিল অসম্ভব সুন্দরী আর বুদ্ধিমতি। সিন্ধিয়া নামের এক তান্ত্রিক রাজকুমারীর রূপে পাগল হয়ে যায়। কালোজাদুতে সিদ্ধহস্ত তান্ত্রিক চেয়েছিল রত্মাবলীকে নিজের করে পেতে। কিন্তু তার পক্ষে রাজকুমারীকে বিয়ে করা ছিল অসম্ভব। অসম্ভবকে সম্ভব করতে সে বিভিন্ন ফন্দি আঁটতে থাকে। একদিন রত্মাবলীর এক দাসী যখন রাজকুমারীর জন্য বিশেষ ধরনের সুগন্ধি তেল আনতে যাচ্ছিল, তখন সিন্ধিয়া দাসীকে কবজা করে মন্ত্রপড়া তেল পাঠিয়ে দেয়। তান্ত্রিক চেয়েছিল, ওই তেলের প্রভাবে সম্মোহিত হয়ে রাজকুমারী তার কাছে চলে আসবে। কিন্তু দাসী যখন তেলের শিশি নিয়ে প্রাসাদে ফিরছিল তখন হঠাৎ তার হাত থেকে শিশিটি একটা পাথরের ওপর পড়ে ভেঙে যায়। ভাঙা শিশির তেল গড়িয়ে পড়ে পাথরে। এরপর যাদুর তেলের প্রভাবে ওই পাথরটি তান্ত্রিকের দিকে চলতে শুরু করে। জাদুমন্ত্রতাড়িত পাথরটি চলতে চলতে একপর্যায়ে তান্ত্রিকের ওপর চেপে বসে এবং নির্মমভাবে তার মৃত্যু হয়।

তবে এ ঘটনাকেও অনেকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের দাবি, রাজকুমারী সখীদের সঙ্গে নিয়ে নিজেই গিয়েছিল সুগন্ধি তেল সংগ্রহে। এসময় সে তেল নিয়ে তান্ত্রিকের মনোভাব বুঝে ফেলে। তাই সে-ই যাদুর তেলের শিশিটি একটি বড়সড় পাথরে আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলেছিল।

যাইহোক, নিজের অপকর্মের শিকার হয়ে তান্ত্রিক নির্মম মৃত্যুর মুহূর্তে প্রতিশোধ নিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মরিয়া তান্ত্রিক সিন্ধিয়া ভানগড় নগরকে বিনাশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। তান্ত্রিকের ইচ্ছানুযায়ী, তার মৃত্যুর পরের দিনের সূর্য নাকি ওই নগরের কারোরই আর দেখার সৌভাগ্য হবে না। আর সেটাই হয়েছিল। রাজকুমারী রত্মাবলীসহ নগরের সকলে এক রাতেই শেষ হয়ে যায়। তবে ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রমাণ কিন্তু ঐতিহাসিকরা খুঁজে পাননি।

আর একটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ভানগড় একরাতে শেষ হয়নি। মৃত্যুর আগে সিন্ধিয়া রাজকুমারীকে বলে যায়, রাজপরিবারের কাউকে সে বাঁচতে দেবে না। আর খোদ রত্মাবলীকে সে মরার পরেও ছাড়বে না। এর কিছুদিন পর প্রতিবেশী রাজ্যের সঙ্গে ভানগড়ের ভীষণ যুদ্ধ বাঁধে। যুদ্ধে রাজপরিবারসহ গোটা ভানগড় ধ্বংস হয়ে যায়। অনেকে বিশ্বাস করে, ওই কেল্লায় নাকি আজও তান্ত্রিক ও রত্নাবতীর অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়ায়।

তবে রাজকুমারী রত্মাবলী ও তান্ত্রিক সিন্ধিয়ার ঘটনা ছাড়াও আরও একটি ঘটনা এই এলাকায় বেশ প্রচলিত আছে। রাজা ভগবন্ত দাসের পুত্র মাধো সিংহের (ছত্র সিংহের বাবা। তার সময়েই ধ্বংস তথা বিলীন হয়ে যায় ভানগড়) জন্য যখন দুর্গ তৈরি হচ্ছিল তখন দুর্গ তৈরিতে বাধা দেয় গুরু বালুনাথ নামের এক ক্ষমতাধর সাধু। দুর্গের পরিকল্পিত চত্বরের এক কোণে বালুনাথের আশ্রম ছিল। বালুনাথ মাধোকে বলেছিল, দুর্গে তার কোনও আপত্তি নেই। তবে এর ছায়া যেন তার আশ্রমের ওপর না পড়ে। তেমন হলে সে দুর্গ সহ সমগ্র রাজবংশকে ধ্বংস করে দেবে।

সাধুর কথায় গুরুত্ব দিয়ে মাধো কথা দিয়েছিল, দুর্গ সেভাবেই নির্মিত হবে। কিন্তু দুর্গ নির্মাণের পর দেখা গেল, দিনে কিছুটা সময়ের জন্য কেল্লার ছায়া বালুনাথের আশ্রমকে ঢেকে দিচ্ছে। ফল যা হওয়ার তাই হল। ক্ষুব্ধ বালুনাথ কেল্লা সহ গোটা ভানগড় রাজ্য ধ্বংস করে দেয়। যদিও ঐতিহাসিকরা এই ঘটনারও প্রত্যক্ষ কোনও প্রমাণ পাননি।

ভানগড় কেল্লার দরজার উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। ঢুকলেই সামনে বাগান। বাগানে ফুলের সুবাস থাকে সব সময়। প্রচণ্ড খরাতেও বাগানের কোনও ফুল নাকি শুকিয়ে যায় না কখনও, এমন বিশ্বাস স্থানীয়দের। এও এক রহস্য! বাগান পেরিয়ে সামনে এগোলেই জলাধার দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় ভাষায় একে ‘বাউলি’ বলে। বাউলির এই অংশ থেকেই অনেকে দিনের বিভিন্ন সময়ে নূপুরের শব্দ শুনতে পেয়েছে। যদিও কেল্লার কোনও শব্দ বাইরে থেকে শোনা প্রায় অসম্ভব।

দুর্গের ভিতরে প্রবেশ করলে দেখতে পাওয়া যাবে এক সময়কার বিশাল নাচমহল। সেখানে নিয়মিত নাচ-গান হত বলে ধারণা করা হয়। এই নাচমহল নিয়েও কম রহস্য নেই। অনেকেই দাবি করেন, এই নাচমহল থেকে এখনও রাতে অন্ধকারে ঘুঙুরের শব্দ শোনা যায়। তবে যুক্তিবাদীরা বলছেন, পরিত্যক্ত ওই নগরীতে প্রচুর বাদুর ও আরশোলার বসতি আছে। রাতে তাদের নড়াচড়ার কারণেই অমন আওয়াজ হয়, যা দুর্গের দেওয়ালে বারংবার প্রতিফলিত হয়ে ঘুঙুর বাজার মতো শব্দের রূপ নেয়।

কিন্তু তারপরেও অনেকে অশরীরী আত্মা থাকার কথা দাবি করেছেন। অবশ্য তার ব্যাখ্যাও দিয়েছে সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার নিয়ে কাজ করা একদল প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর। এই দলের বেশ কয়েকজন সদস্য দুর্গে নেগেটিভ অ্যানার্জির উপস্থিতির কথা স্বীকার করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, তাঁদের ক্যামেরায় অদ্ভুত রকম কিছু ছবি ধরা পড়েছে। সেগুলি অশরীরী আত্মার কিনা তা অবশ্য বোঝা যায়নি। তবে ছবিগুলি মোটেও স্বাভাবিক নয়।

ওই সন্ধানী দলটি দুর্গে নেগেটিভ অ্যানার্জি থাকার কারণও ব্যাখ্যা করেছে। তাঁদের কথায়, এমন কোনও শক্তি যা দীর্ঘকাল ধরে একই জায়গায় আটকে থাকে এবং কোনও কারণে যার স্বাভাবিক চলাচল থমকে যায়, তেমন শক্তিকে নেগেটিভ অ্যানার্জি বলে। এই রকমই কোনও শক্তির উপস্থিতি সেখানে অবশ্যই আছে।

বিজ্ঞান অশরীরী আত্মা বা ভূতকে কখনও সরাসরি স্বীকার করে না। আবার তার অস্তিত্বকে সরাসরি অস্বীকারও করে না। প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটররা বলছেন, বিজ্ঞানের এমন অবস্থানের পিছনে কারণ হচ্ছে, ‘ভূত আছে’ এমন প্রমাণের চেয়ে ‘ভূত নেই’ এমন প্রমাণ বিজ্ঞানের হাতে অনেক বেশি রয়েছে। তার মানে বিজ্ঞানের হাতেও ভূতের অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে! যদিও সেই প্রমাণ সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম।

প্যারানরমাল সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার কথায়, যে কোনও স্থান যদি ৪০ দিনের চেয়েও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকে, সেখানে নেগেটিভ অ্যানার্জি সঞ্চিত হয়। ভানগড় দুর্গ বছরে পর বছর জনবিরল হয়ে পড়ে রয়েছে। এমন অবস্থায় সেখানে নেগেটিভ অ্যানার্জির অনুভব হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে প্যারানরমাল সোসাইটি অব ইন্ডিয়া এও বলছে, তাদের দল যখন সেখানে তদন্তে যায়, তখন সেখানে এমন কিছু অনুভব হয়নি যার ওপর ভিত্তি করে বলা যায় যে ভানগড়ে ভূত বা আত্মার মতো কোনও ভয় জাগানিয়া বিষয়ের অস্তিত্ব রয়েছে।

তবুও ভূতের ভয়কে অস্বীকার করতে পারে না দুর্ধর্ষ কোনও সাহসীও। কোনও রকম অঘটন ঘটার আগেই তাই সতর্ক হয়েছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ। তারা সূর্যাস্তের পর আর সূর্যোদয়ের আগে ভানগড় দুর্গে প্রবেশ একেবারেই নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর