Thursday, April 3, 2025

বিষয় বাংলাদেশ : সারা দেশ জুড়ে এত ভাঙচুর কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

- Advertisement -

সারা বাংলাদেশ জুড়ে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে এত ভাঙচুর কেন, তার কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। কারও কারও ধারণা, এসব আওয়ামীলীগ সরকারের উপর সাধারণ মানুষের বিতৃষ্ণার ফল। যদি সেটাই হত তবে শেখ মুজিবর রহমান সহ স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য ভাস্কর্য-ম্যুরাল ভেঙে ফেলার কারণ কী?

বাংলাদেশ 2
Symbolic Image – Image by Pixabay

ভাঙচুর! আর ভাঙচুর! একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে এটাই বোধহয় প্রথম, যেখানে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে সারা দেশ জুড়ে প্রায় দেড় হাজার ভাস্কর্য-ম্যুরাল ভেঙে ফেলা হয়েছে খোদ বাংলাদেশ এর মাটিতে। অন্তত এমনটাই জানা যাচ্ছে সে দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’-র অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট থেকে। সারা দেশ থেকে খোঁজ নিয়ে তথ্যটি সংগ্রহ করেছে ‘প্রথম আলোর’-র প্রতিনিধিরা।

ভাঙচুরের সূচনা

প্রথমে কোটা সংস্কার আন্দোলন, সেই আন্দোলনের দাবি মানার পর শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি এবং সেই দাবিও মানার পর সব শেষে ভাস্কর্য-ম্যুরাল ভাঙচুর। এ যেন এক অন্য দেশ দেখল গোটা বিশ্ব। বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে এক সময় কম সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটেছিল এই বাংলাদেশ এই (১৯৭০-৭১ সাল)। আর এবার কম সময়ের মধ্যে (৫ আগস্ট থেকে ১৪ আগস্ট) সবচেয়ে বেশি ভাস্কর্য-ম্যুরাল ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটল সেই বাংলাদেশ এই। ঘটনাক্রমে প্রথম ঘটনাটি ছিল পরাধীন বাংলাদেশ এর। আর দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটলো স্বাধীন বাংলাদেশ এ।

প্রথম আলোর রিপোর্ট

প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, তাদের প্রতিনিধিরা সারা দেশ থেকে ভাঙচুরের যে তথ্য সংগ্রহ করেছে তা থেকে জানা যাচ্ছে, ৫ আগস্ট থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে দেশের ৫৯টি জেলা জুড়ে মোট ভাস্কর্য-ম্যুরাল ভাঙা হয়েছে ১,৪৯৪টি। তার মধ্যে রয়েছে ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ। এর অধিকাংশ জুড়ে রয়েছে দেশটির জাতির পিতা শেখ মুজিবর রহমান ও স্বাধীনতা সংগ্রাম কেন্দ্রিক ভাস্কর্য-ম্যুরাল। এছাড়াও বাদ যায়নি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জগদীশচন্দ্র বসু, লালন ফকির, ইয়াসির আরাফত সহ দেশ-বিদেশের একাধিক কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, বিপ্লবী, রাজনীতিবিদ প্রমুখের ভাস্কর্য-ম্যুরাল। বাদ যায়নি সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন স্থানের গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্যটিও। এসবই ভাঙা হয়েছে জনসমক্ষে হাতুরি, শাবল, জেসিপি সংযোগে। কোথাও বা ভাস্কর্য ভাঙার পর ক্রান্ত না হয়ে পুড়িয়েও দেওয়া হয়েছে ভাস্কর্যগুলিকে।

আরও ভাঙচুর

শুধু এখানেই থেমে নেই। দেশটিতে হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া কিছু দুস্কৃতির হাতে ভেঙে তছনছ হয়ে গিয়েছে একাধিক বাড়ি, দোকানপাট, কর্ম প্রতিষ্ঠান, সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় ইত্যাদি। যার সঠিক হিসেব পাওয়া খুবই মুশকিল। দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরেও চলেছে একাধিক ভাঙচুরের ঘটনা। এমনকি দেশের একাধিক অঞ্চলে এখনও ভাঙচুরের ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। গ্রামবাসীদের রাত জেগে পাহারা দেওয়ারও বন্দোবস্ত হয়েছে কোথাও।

- Advertisement -

ঋত্বিক ঘটকের জন্ম ভিটে ভাঙচুর

এই ভাঙচুরের ঘটনা থেকে রক্ষা পায়নি বিখ্যাত চলচিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের জন্ম ভিটেও। রাজশাহীর ঘোড়ামারা মহল্লার মিয়াপাড়ার এই বাড়িতেই ছেলেবেলার কয়েকটি বছর কাটিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক। এখানে এক সময় বহু বরেণ্য সাহিত্যিকের আনাগোনাও ছিল। এখানে সময় পায়ের ধুলো দিয়েছিলেন কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীও।

বসতবাড়ির ৩৪ শতাংশ জমি আগেই (১৯৮৯ সাল) এরশাদ সরকার হোমিওপ্যাথিক কলেজের জন্য ইজারা দিয়েছিল। বাকি অংশটিও এবার বেহাত হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে। কিছুদিন আগেও ঋত্বিক ঘটকের জন্ম ভিটের বাড়িটি মাথা তুলে কোনও রকমে দাঁড়িয়েছিল। ৫ আগস্টের পর এখন সেটিও আর অবশিষ্ট নেই।

এই ভাঙচুর কীসের ইঙ্গিত?

সারা বাংলাদেশ জুড়ে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে এত ভাঙচুর কেন, তার কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। কারও কারও ধারণা, এসব আওয়ামীলীগ সরকারের উপর সাধারণ মানুষের বিতৃষ্ণার ফল। যদি সেটাই হত তবে শেখ মুজিবর রহমান সহ স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য ভাস্কর্য-ম্যুরাল ভেঙে ফেলার কারণ কী? আন্দোলনকারী ছাত্ররাই কি এসবের সঙ্গে যুক্ত। যদি তাঁরা না যুক্ত থাকেন, তবে কারা ঘটিয়েছে এসব? তাহলে কী দেশের ইতিহাসকেই মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে একশ্রেণীর মানুষ।

কোথাও কোথাও দেশ বিদেশ-বিদেশের একাধিক কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, বিপ্লবী, রাজনীতিবিদ প্রমুখের ভাস্কর্য-ম্যুরাল ভাঙচুর হয়েছে। এসব ভাঙচুরের মানে কী? দেশের সুশিক্ষিত ছাত্র সমাজ কখনওই কি এসবে অংশ নেওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারবে? যদি না হয়, তাহলে কারা যুক্ত রয়েছে এসবের সঙ্গে? সমাজের পথ প্রদর্শকদের অস্বীকার করতে চাইছে কি তারা?

একাধিক অঞ্চলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়, মূর্তি এমনকি সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন স্থানের গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এসবের সঙ্গে আদৌ কি কোটা সংস্কার আন্দোলনের কোনও সম্পর্ক রয়েছে? সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার, তাদের উপাসনালয় ও মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনা বাংলাদেশ এর ইতিহাসে বেশ পুরনো। ১৯৪৭ সালের পর এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও বহুবার ঘটেছে এমন ঘটনা। এসবের সঙ্গে কারা যুক্ত রয়েছে তা আর কারওই প্রায় অজানা নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ের এই ভাঙচুরের ঘটনা কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

২০১৬ সালে গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠার সময়েও বাংলাদেশের একশ্রেণীর মানুষ ভাস্কর্যটির ঘোর বিরোধিতা করেছিল। পরে নির্দিষ্ট স্থান থেকে সেটিকে সরিয়েও নেওয়া হয়েছিল। তাতে শিল্পী মহল প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু এবার আর কোনওভাবেই সেটিকে রক্ষা করতে পারেননি তাঁরা। এসব কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়।

অবশেষে প্রতিবাদ

ইতিহাস যেমন ভাঙতে জানে, তেমন গড়তেও জানে। বাংলাদেশ এ এমন ঘটনা বহুবার হয়েছে। ভাস্কর্য-ম্যুরাল বহুবার ভাঙা হয়েছে। আবার দক্ষ শিল্পীর হাতে নব নির্মাণও হয়েছে। শিল্পী মহলের একাংশ তাই এবারও গর্জে উঠেছে দেশ জুড়ে। প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন প্রান্তে। নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতিমধ্যে ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ভাস্কর্য নির্বাচন করতে শুরু করেছে। হয়তো সবগুলিকে ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। কিছুটা অন্তত সংস্কার হোক, এমনটাই চাইছে শিল্পী মহল।

- Advertisement -

এই রকম আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর