সমুদ্রতলের শান্ত আগ্নেয়গিরিগুলিতে তখন প্রবাল কীট বাসা বাঁধতে থাকে। প্রবাল কীট মারা যাওয়ার পরে ক্রমশ জমতে থাকে তাদের দেহাবশেষ। ক্রমে সেই বাসা উঁচু হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর চলে আসে। এর আকার গোলাকার, ডিম্বাকার বা এবড়োখেবড়োও হতে পারে। একে বলা হয় তখন প্রবালপ্রাচীর। পরে মাঝের ফাঁকা অঞ্চলে ঢেউয়ের সঙ্গে নুড়ি-বালি প্রবেশ করে দীর্ঘদিন জমতে জমতে তৈরি হয় প্রবালদ্বীপ।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে অতি দ্রুত। আর তাই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি বছর কমপক্ষে এক ইঞ্চি করে বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা তাই সমুদ্রে ভেসে থাকা প্রবালদ্বীপ গুলিকে নিয়ে যথেষ্ট আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের ধারণা, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের দ্রুত উচ্চতা বাড়ার কারণে অদূর ভবিষ্যতে এই প্রবালদ্বীপ গুলিকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। জলের নিচে তলিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় তাঁরা লক্ষ্য করেছেন, এখনই প্রবালদ্বীপ গুলির জলের নিচে তলিয়ে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লেও অদ্ভুত উপায়ে তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারছে। যদিও এই নিয়ে এখনও চলছে গবেষণা। বিজ্ঞানীরা উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন, কীভাবে প্রবালদ্বীপ গুলির এই টিকে থাকা সম্ভব।
প্রবালদ্বীপ কীভাবে তৈরি হয়? অতীতে সমুদ্র অঞ্চলের দুর্বল ভূমিভাগে ফাটল সৃষ্টি হয়ে আগ্নেয়গিরির উৎপত্তি হয়েছিল। দীর্ঘদিন লাভা নির্গত হওয়ার পর এক সময় সেই আগ্নেয়গিরিগুলি শান্ত হয়ে পড়ে। সমুদ্রতলের শান্ত আগ্নেয়গিরিগুলিতে তখন প্রবাল কীট বাসা বাঁধতে থাকে। প্রবাল কীট মারা যাওয়ার পরে ক্রমশ জমতে থাকে তাদের দেহাবশেষ। ক্রমে সেই বাসা উঁচু হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর চলে আসে। এর আকার গোলাকার, ডিম্বাকার বা এবড়োখেবড়োও হতে পারে। একে বলা হয় তখন প্রবালপ্রাচীর। পরে মাঝের ফাঁকা অঞ্চলে ঢেউয়ের সঙ্গে নুড়ি-বালি প্রবেশ করে দীর্ঘদিন জমতে জমতে তৈরি হয় প্রবালদ্বীপ।
এই প্রবালদ্বীপ গুলিতে পরবর্তীতে প্রাণের বিকাশ ঘটে এবং বসবাসের উপযোগীও হয়ে ওঠে। পৃথিবীর প্রতিটি মহাসাগরে এরকম ছোট-বড় অসংখ্য প্রবালদ্বীপ হয়েছে। মালদ্বীপ, লাক্ষাদ্বীপ, মাইক্রোনেশিয়া প্রভৃতি উদাহরণ হিসাবে বলা যায়। এই দ্বীপগুলি যে আসলেই প্রবাল দিয়ে নির্মিত তা ১৮৭৬ সালে সর্বপ্রথম উল্লেখ করেন চার্লস ডারউইন।
এই দ্বীপগুলিকে নিয়েই এখন যথেষ্ট আশঙ্কায় রয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ যে হারে মেরু অঞ্চলের বরফ গলনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের জলতল বাড়ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে প্রবালদ্বীপ গুলি আদৌ জেগে থাকতে পারবে তো? সাম্প্রতিক গবেষণায় তারা লক্ষ্য করেছেন, আপাতত সেই সম্ভাবনা এখন নেই। সমুদ্রপৃষ্ঠের জলতল যদিও বাড়ছে নিয়মিত। কিন্তু প্রবালদ্বীপ গুলি অতি আশ্চর্য উপায়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারছে।
দীর্ঘদিন গবেষণার পর তারা দেখেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবালদ্বীপ গুলি ভাঙা-গড়ার মাধ্যমে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারছে। কোনওটি সংকুচিত হচ্ছে আবার কোনওটি আকারে বাড়ছে। দ্বীপের একদিকে ঢেউয়ের আঘাতে ক্ষয় পেলেও অপরদিকে আবার পলি সঞ্চিত হয়ে আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্বীপের স্থান পরিবর্তিত হলেও কখনও হারিয়ে যাচ্ছে না।
এই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা উড়োজাহাজ থেকে তোলা কয়েক দশকের পুরনো ছবিগুলির পাশাপাশি নতুন করে তোলা ছবিগুলি মিলিয়ে দেখেছেন। এছাড়াও তারা ভূমি পরিমাপের জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, সেন্সর ব্যবহার করেছেন।